করোনাকালীন ঈদ নিয়ে জবির তরুণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা

0
187

ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষা, আড্ডা, গান আর ঘুরাফেরায় ওদের সময় টা যাচ্ছিল বেশ।  হঠাৎ কালো মেঘে ধেয়ে গেলো পুরো পৃথিবী। বন্ধ হয়ে গেলো তাদের ক্লাস-পরীক্ষা, আড্ডা, গান, ঘুরাফেরা। চলে গেল সবাই গ্রামের ঠিকানায়, কিছু দিনের ব্যাবধানে হয়ে গেল গৃহবন্দি। সময় টা ছিলো চলতি বছরের মার্চ মাসে। দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের ৯ দিন পর ১৭ মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সরকার।

করোনার কবলে পরে যখন পুরো পৃথিবী মৃত্যুপুরি হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনি  বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ পাওয়ায় ভাইরাস থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা ঘরবন্দি হয়ে শেষ করল বৈশাখ, মাহে রমজান, ঈদুল ফিতর। ঈদুল আযহাও কেটে যাবে এভাবে। বৈশ্বিক মহামারি পাল্টে দিয়েছে ঈদের প্রকৃতি। করোনাকালীন ঈদ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কি ভাবনা, -এ নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।

মোঃ সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার :
(শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ)
ঈদ মানে হাসি ঈদ মানে খুশি। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়ে একত্রে সকলে উৎসবে মেতেওঠা চিরায়ত রীতি। এবারের ঈদুল আযহা নিশ্চয়  ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা স ার করবে। ত্যাগের মহিমায় অনুপ্রাণিত হয়ে ঈদের দিন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইচ্ছা রয়েছে। নিজ এলাকার অস্বচ্ছল পরিবারের জন্য আমাদের  পরিবারের সামর্থ অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। কোরবানির পশুর মাংস বন্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব পরিবারের ছোটসন্তান হিসেবে আমার উপর  থাকে ফলে সেটি পালন করতে হবে। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে আমাদের সামজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করণ ও স্বাথ্যবিধি মানতে মানুষকে সচেতন করতে কাজ করবো। আমাদের সচেতনতাই পারে চলমান সংকট মোকাবিলা করতে। চলমান পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আমাদেরকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে, ফলে ঈদকে কেন্দ্র করে ঘোরাঘুরি বা উদযাপন সেটি থেকে বিরত থাকবো। পরিবারের সাথে নিজগৃহে উদযাপন হবে এবারের ঈদ। সুস্থ পৃথিবীতে  প্রানবন্ত আবহে চিরায়ত ঈদ উদযাপনের অপেক্ষায় এবারের ঈদ উদযাপন নিশ্চয় অপূর্ণতা রেখে যাবে।

ডলি শারমিন :
(শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ)
ঈদ মানে উৎসবের সাঁইরেন,খুশির আমেজ। শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ মানে বাড়ি ফেরার আনন্দ, একরাশ সুখ। প্রতিবছর ঈদের সময়টা আসলে কত কি পরিকল্পনা করা হতো। ঘুরাঘুরি, হৈ হুল্লোড়, আড্ডা, মজা-মাস্তি কত কি করতাম। এটা ওটা প্যান করে বাস-ট্রাকের বিশাল একটা জ্যাম ঠেলে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরা হতো ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে। ঈদের দিন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া,বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরাঘুরি, বিভিন্ন পার্টি অ্যারেঞ্জমেন্ট নানান কিছু করা হতো ঈদের ছুটির এই সময়টাতে। কিন্তু এবারের ঈদটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। কোভিড-১৯ এই পরিস্থিতিতে এবারের ঈদ আনন্দের গল্পটাও ব্যতিক্রম। এবার নেই আর বাড়ি ফেরার আনন্দ,ঘটা করে আনন্দ উদযাপনের কোনো সুযোগও নেই এবার। শুধু আমার গল্পে নয়, সমস্ত মুসলিমের কাছেই ঈদের এই সময়টা অন্যরকম বার্তা নিয়ে এসেছে। আমার এবারের ঈদের সময়টা কাটানো হবে শুধুমাত্র পরিবারের সাথে।অর্থাৎ আগেরমতো ঘুরাঘুরি,হৈ হুল্লোড় আর হচ্ছেনা এবার। যেহেতু আমরা একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেহেতু নিজের, পরিবারের এবং দেশের সুস্থতার জন্য একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আনন্দকে ভাগাভাগি করার চেষ্টা করবো। আবার যেহেতু এটা কোরবানির ঈদ এবং এই সংকটের মধ্যে সবথেকে বেশি সংকটে আছেন অসহায় দরিদ্র মানুষগুলো সেহেতু নিজ জায়গা থেকে তাদের মাঝে কিছু সাহায্য সহযোগিতা করে সুখ ভাগাভাগি করার চেষ্টা করবো। প্রতিবারের মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও পরিবারের সাথে স্বাভাবিকভাবে ঘরে বসেই এবারের ঈদ আনন্দটা উপভোগ করার চেষ্টা করবো। কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে সামনের ঈদগুলোতে আমরা হয়তো আজকের এই ছোটো পরিসরের ঈদ আনন্দকে আরো দ্বিগুন করে পেতে পারি। এই মুহূর্তে নিরাপদ থাকা এবং সুস্থতাই বিবেচ্য বিষয়। সবার ঈদ ভালো কাটুক, সুস্থ থাকুন এই কামনায়।

সৈয়দ মুমিনুল ইসলাম পুস্পন :
(শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ)
আসলে কোভিড-১৯ এর মতো একটা আতংক যেহেতু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে। সেখানে  স্বাভাবিকভাবে অন্য  বছরের  মতো ঈদপালন করা হবে না। কোরবানির ঈদ আমাদের মুসলিম সম্প্রদায়ের  খুশির মুহূর্ত। গরু কিনতে হাটে গিয়ে সবাই উৎসব উচ্ছাসে মেতে উঠতো। কিন্তু এইবার বাহিরে ঘুরাঘুরি কারও জন্যই নিরাপদ নয়। প্রবাসীরাসহ অধিকাংশ মানুষই এবার অর্থের সমস্যায় রয়েছেন। সবমিলিয়ে আমাদের অন্য বছরের মতো খুশিটা ভাগ করা হবে না। আমাদের বেশিরভাগ সময়ই বাসায় বসে উদযাপন করতে হবে, যেটা কিছুটা বিরক্তিকর। তবে যদি করোনা দুর্যোগটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, পৃথিবী সাভাবিক চেহারাতে ফিরে আসে, আবার সবাই একত্রিত হতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের মতো ঘুরতে পারি, টিএসসি,শান্তচত্তর, কাঠালতলায় আগের মতো আড্ডা জমে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের মতো অনক্যাম্পাস পড়াশোনা হয়, সেটাই আমদের জন্য অনেক বড় ও আনন্দের ব্যাপার হবে। সবার ঈদ ভালো কাটুক।

বানী চৌধুরী :
(শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ)
এবারের ঈদ অন্যান্য ঈদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এবার করোনা পরিস্থিতিতে আমরা ঈদের পুরো সময়টা বাসায় কাটাতে পারছি। দেখা যায়, অন্যান্য ঈদে আমরা অল্প সময় পরিবারের সাথে কাটাতে পারি। কিন্তু এবার আমরা বাসায় পরিবারের সাথে অনেক সময় কাটাতে পারছি। তবে এই সময়টা এক দিকে ভালো আমরা যারা দূরে থাকি তারা পরিবারের খুব কাছে থেকে হাসি কান্নার সাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। যারা পরিবারের ভরনপোষণ বহণ করেন তাদের জন্য এই ঈদটা হয়ত আনন্দের নাও হতে পারে। তাই এই ঈদ কারো আনন্দের কারো একটু আলাদা। সময়ের সাথে তাল মিলাতে আমাদেরকে সামনে আগাতে হবে। আবার মহামারি করোনা থেকেও আমাদেরকে বাচতে হবে। তাই এবারের ঈদে কোথাও ঘুরতে যাওয়া একদমই ঠিক হবে না। আর শুধু ঈদ বলে না আমাদের উচিত যতদিন না করোনাভাইরাস পৃথিবী ছেড়ে না যাচ্ছে, ততদিন আমাদের এইরকম সচেতন থাকতে হবে, আর যদি নিজেরা একটু সচেতন থাকতে পারি আর এই করোনাভাইরাসকে আমরা প্রতিহত করতে পারি তাহলে সামনে আরো অনেক ঈদ একসাথে করতে পারবো।সবাইকে ঈদ মোবারক। অনেক ঈদ একসাথে করতে পারবো। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

মোঃ সানাউল্লাহ সাজিদ :
(শিক্ষার্থী, ইসলাম শিক্ষা বিভাগ)
করোনায় ব্যতিক্রমধর্মী কুরবানী। কুরবানী মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অপরিহার্য ইবাদত। যেহেতু কুরবানীর কোন কাযা নেই। অতএব বিশেষ সতর্কতার সাথে আমাদেরকে কুরবানী পালন করতে হবে। প্রতি বছর সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব। প্রতিবছর গরু কেনার জন্য পরিবারের সদস্যদের সাথে বিভিন্ন হাটে যেতাম, মুলামুলি করে গরু কিনতাম। কিন্তু এবার এক ব্যাতিক্রম অভিজ্ঞতা হল। একটা পরামর্শ হচ্ছে গতবছরের কুরবানীর বাজেট ঠিক রেখে এ বছর তার চেয়ে কম মূল্যের টাকা দিয়ে কুরবানী করে অবশিষ্ট টাকা গরিব,মিসকিন, এতিমদের মাঝে দান করে দেয়া।  ঈদের দিন  সমাজের গরিব অসহায়দের বাড়িতে মাংস নিয়ে উপস্থিত হতাম। এবারও তাই করা যাবে। তবে সামাজিক দুরত্ব ও স্বাস্থবিধি মেনে চলে। যতটুকু সম্ভব অযথা বাইরে ঘোরাফেরা না করাই উত্তম। ইনশাল্লাহ এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে। পুরোনো ঈদের মত আবার আনন্দ হবে।

ফৌজিয়া বন্যা :
(শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ)
ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানেই খুশি। মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা বছরে দুটি ঈদ পালন করে থাকে।এই দুটি ঈদকে ঘিরে থাকে অনেক কল্পনা অনেক খুশি আনন্দ।বিশেষ করে কুরবানির ঈদ সবার কাছে আলাদা। সবার সাথে গরুর হাটে যাওয়া, দামাদামি করে গরু কেনা এবং ঈদের আগের কয়দিন গরুর দেখাশুনা করা এইসবের মধ্যে আলাদা টান রয়েছে। তবে এইবারের ঈদ অনেকটাই অন্যরকম। সারাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে সবাই লকডাউনরত অবস্থায় রয়েছে। এই মহামারিতে সুস্থ থাকাটাই একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। করোনার ভয়াবহতা থেকে যেখানে ঘর থেকেই বের হওয়া বিপদজনক সেখানে দলবেঁধে হাটে যাওয়া, কেনাকাটা করা, মার্কেট যাওয়া ইত্যাদি করে নিজেদের মৃত্যুর দিকে ধাবিত করা ছাড়া আর কিছুই নাহ। তবুও এই ঘৃহবন্দি জীবন কারো কাছেই সুখকর নয়। কিন্তু নিজের জন্য নিজের ফ্যামিলির জন্য সর্বপরি দেশের মানুষের জন্য সবারই ঘরে থাকা এবং এই পরিস্থিতিতে যতটা সম্ভব সামাজিক দূরত্ব মেনে অসহায় মানুষদের সাহায্য করা।
তাই আমি মনকে সান্তনা দিয়েছি ঈদে নাহয় ঘরেই থাকলাম যাতে করে আমি আমার ফ্যামিলি ভালো থাকে সুস্থ থাকে। যতটা সম্ভব নিয়ম মেনে কুরবানির সকল কাজ করব এবং অসহায় গরিব মানুষদের সাহায্য করব। এছাড়া ভার্চুয়ালভাবে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবো।

আবারো আসবে আলোর দিন। যখন থাকবে না আর কোন বাঁধা, আবারো ফিরে যেতে পারবো সেই চিরচেনা সবুজ ক্যাম্পাস, ফিরে আসবে সেই গানের সুর, চায়ের কাপের চুমুকে চুমুকে চলতে থাকবে তাদের আড্ডা। আবার এমনি কোন এক ঈদের নামাজ শেষে কুশল বিনিময়ে মগ্ন থাকবে। তাতে থাকবে না কোন বাধা। পুরনো ঈদ আবারো ফিরে আসবে নতুন রূপে এই আশা করছেন তরুণ শিক্ষার্থীরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here